বিড়াল পোষার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো আমাদের সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো শরীরে উকুন বা ফ্লির (Fleas) উপদ্রব। এই ছোট ছোট পরজীবীগুলো বিড়ালের পশমের নিচে লুকিয়ে অনবরত রক্ত চোষে, যার ফলে বিড়াল প্রচণ্ড চুলকানি ও অস্বস্তিতে ভোগে। সঠিক সময়ে এর প্রতিকার না করলে বিড়ালের ত্বকে ইনফেকশন হতে পারে এবং মারাত্মক রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। নিচে বিড়ালের শরীরে উকুন ও ফ্লি হওয়ার প্রধান লক্ষণ এবং তা দূর করার কার্যকরী সমাধানগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
বিড়ালের শরীরে উকুন বা ফ্লি হওয়ার প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms):
আপনার বিড়ালের শরীরে এই পরজীবীগুলো বাসা বেঁধেছে কি না, তা নিচের লক্ষণগুলো দেখে সহজেই বুঝতে পারবেন:
- অতিরিক্ত শরীর চুলকানো বা কামড়ানো: বিড়াল সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন তার শরীর, বিশেষ করে ঘাড়, পিঠ এবং লেজের গোড়ার অংশ পা দিয়ে চুলকায় বা দাঁত দিয়ে কামড়াতে থাকে।
- পশমের গোড়ায় কালো দানা বা ফ্লি ডার্ট (Flea Dirt): বিড়ালের পশম উল্টে চামড়ার দিকে তাকালে ছোট ছোট কালো বা খয়েরী রঙের গোল মরিচের দানার মতো ময়লা দেখা যায়। এগুলো মূলত ফ্লির মল। একটি ভেজা টিস্যু দিয়ে এই দানাগুলো মুছলে যদি টিস্যুটি লালচে হয়ে যায়, তবে নিশ্চিত হোন এগুলো ফ্লি ডার্ট।
- পশম ঝরে যাওয়া ও চামড়া লাল হওয়া: অতিরিক্ত চুলকানির কারণে ওই নির্দিষ্ট জায়গার পশম উঠে যেতে পারে এবং চামড়া লাল হয়ে ঘা বা অ্যালার্জির (Flea Allergy Dermatitis) সৃষ্টি হতে পারে।
- অস্থিরতা ও মেজাজ খিটখিটে হওয়া: শরীরে অনবরত কামড়ানোর কারণে বিড়াল শান্ত হয়ে ঘুমাতে পারে না। সে সারাদিন অস্থির থাকে এবং মাঝেমধ্যে হুট করে লাফিয়ে ওঠে।
- মাড়ি ফ্যাকাশে হওয়া (রক্তশূন্যতা): ছোট বিড়ালের (Kitten) শরীরে অতিরিক্ত ফ্লি হলে তারা দ্রুত রক্তশূন্যতায় (Anemia) ভোগে। এতে তাদের মুখের ভেতরের মাড়ি গোলাপী রঙের বদলে ফ্যাকাশে সাদাটে দেখায়।
উকুন ও ফ্লি দূর করার কার্যকরী সমাধান (Solutions):
বিড়ালের শরীর থেকে উকুন ও ফ্লি পুরোপুরি দূর করতে আপনাকে নিচের ধাপগুলো ধাপে ধাপে অনুসরণ করতে হবে:
- স্পট-অন (Spot-on) ড্রপ ব্যবহার করুন: এটি বিড়ালের উকুন ও ফ্লি দূর করার সবচেয়ে আধুনিক ও কার্যকরী উপায়। ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বিড়ালের বয়স ও ওজন মেপে ভালো ব্র্যান্ডের স্পট-অন ড্রপ (যেমন: Frontect, Broadline বা Revolution) বিড়ালের ঘাড়ের পেছনের চামড়ায় (যেখানে বিড়ালের মুখ পৌঁছায় না) লাগিয়ে দিন। এটি ১-২ মাসের জন্য বিড়ালকে ফ্লি মুক্ত রাখে।
- ফ্লি কম্ব (Flea Comb) বা চিকন চিরুনি ব্যবহার: প্রতিদিন নিয়ম করে বিড়ালের পশম ফ্লি চিরুনি দিয়ে ভালো করে আঁচড়ে দিন। চিরুনিতে উকুন বা ফ্লি আটকে আসলে তা সাথে সাথে সাবান-পানি বা ডেটল মিশ্রিত পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলুন।
- অ্যান্টি-ফ্লি শ্যাম্পু দিয়ে গোসল: বিড়ালের বয়স যদি ৩ মাসের বেশি হয়, তবে ভালো মানের কোনো অ্যান্টি-ফ্লি বা মেডিকেটেড শ্যাম্পু দিয়ে তাকে গোসল করাতে পারেন। শ্যাম্পু লাগানোর পর অন্তত ৫-১০ মিনিট শরীরে রেখে তারপর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। (মনে রাখবেন, বিড়াল অসুস্থ বা ঠান্ডা লাগা থাকলে গোসল করানো যাবে না)।
- ঘর ও লিটার বক্স পরিষ্কার রাখুন: ফ্লি কেবল বিড়ালের শরীরে থাকে না, এরা ঘরের কার্পেট, বিছানা এবং সোফার কোনায় ডিম পাড়ে। তাই বিড়ালের বিছানা, কুশন ও খেলনা গরম পানি ও ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। পুরো ঘর নিয়মিত ভ্যাকুয়াম বা পরিষ্কার করুন।
- কৃমির ওষুধ (Deworming) নিশ্চিত করুন: ফ্লি বা কামড়ানোর পোকা পেটে চলে গেলে বিড়ালের ফিতাকৃমি (Tapeworm) হওয়ার সম্ভাবনা ১০০% বেড়ে যায়। তাই ফ্লি-র চিকিৎসা করার পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শে বিড়ালকে সঠিক সময়ে কৃমির ওষুধ অবশ্যই খাওয়ান।
অত্যন্ত জরুরি সতর্কবার্তা: কুকুরের ফ্লি দূর করার কোনো ওষুধ বা ড্রপ বিড়ালের শরীরে ভুলেও ব্যবহার করবেন না। কুকুরের ওষুধে ‘পারমেথ্রিন’ (Permethrin) নামক উপাদান থাকে যা বিড়ালের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত এবং এতে বিড়ালের মৃত্যু হতে পারে। এছাড়া মানুষের মাথার উকুন মারার শ্যাম্পু বা সাবান বিড়ালের শরীরে কখনোই লাগাবেন না।