বিড়াল স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্রাণী। তারা সাধারণত মল-মূত্র ত্যাগের জন্য লিটার বক্স ব্যবহার করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্তু আপনার আদরের বিড়ালটি যদি হঠাৎ বা বারবার লিটার বক্সের বাইরে বিছানা, সোফা, কার্পেট কিংবা ঘরের কোণায় প্রস্রাব করা শুরু করে, তবে এটিকে কেবল দুষ্টুমি ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। এটি হতে পারে তার কোনো শারীরিক অসুস্থতা কিংবা মানসিক কষ্টের একটি নীরব প্রকাশ। নিচে বিড়ালের লিটার বক্সের বাইরে প্রস্রাব করার প্রধান লক্ষণ, কারণ এবং এর কার্যকরী সমাধানগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
লিটার বক্সের বাইরে প্রস্রাব করার সাথে অন্যান্য যেসব লক্ষণ খেয়াল করবেন (Symptoms):
বিড়াল কেন এমন আচরণ করছে তা সঠিকভাবে বুঝতে নিচের উপসর্গগুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দিন:
- নরম জায়গায় প্রস্রাব করার প্রবণতা: লিটার বক্স ছেড়ে কাপড়ের স্তূপ, নরম বিছানা, পাপোশ কিংবা সোফার ওপর প্রস্রাব করা।
- প্রস্রাব করার সময় ডাকাডাকি করা: প্রস্রাব করার পজিশন নেওয়ার পর ব্যথায় মেউ মেউ করে কান্নার মতো শব্দ করা।
- লিটার বক্সের ঠিক পাশেই প্রস্রাব করা: বক্সে না ঢুকে ঠিক তার বাইরে বা বক্সের দেয়ালে প্রস্রাব করে রাখা।
- বারবার প্রস্রাবের রাস্তা চাটা: প্রস্রাব করার আগে বা পরে নিজের পেছনের যৌনাঙ্গ অতিরিক্ত পরিমাণে চাটতে থাকা।
- লিটার বক্সে গিয়েই তাড়াহুড়ো করে বের হওয়া: বক্সে ঢোকার পর প্রস্রাব না করেই অস্থির হয়ে লাফ দিয়ে বের হয়ে আসা।
বারবার বাইরে প্রস্রাব করার কারণ ও কার্যকরী সমাধান (Solutions):
বিড়ালের এই অস্বস্তিকর আচরণ দূর করতে আপনি নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারেন:
- শারীরিক বা চিকিৎসাগত সমস্যা (Medical Issues): বিড়ালের ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI), মূত্রথলিতে ক্রিস্টাল বা পাথর হওয়া এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগ হলে প্রস্রাব করার সময় প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া ও ব্যথা হয়। বিড়াল তখন মনে করে লিটার বক্সে গেলেই বুঝি এই ব্যথাটা হচ্ছে, তাই সে বক্সের বাইরে নরম জায়গায় প্রস্রাব করে।
সমাধান: এমনটা হলে সবার আগে একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তারের কাছে নিয়ে তার ইউরিন টেস্ট করান এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করুন।
- নোংরা লিটার বক্স (Dirty Litter Box): বিড়াল নোংরা পরিবেশ একদম সহ্য করতে পারে না। বক্সে যদি আগের মল-মূত্র জমে থাকে কিংবা লিটার থেকে দুর্গন্ধ বের হয়, তবে বিড়াল সেখানে পা রাখতেই চায় না।
সমাধান: প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ২ বার লিটার বক্স পরিষ্কার (Scoop) করুন। প্রতি সপ্তাহে বা দুই সপ্তাহে একবার পুরো বক্সের বালি ফেলে দিয়ে সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে নতুন বালি দিন।
- লিটার বক্সের ভুল অবস্থান ও সাইজ: লিটার বক্সটি যদি খুব কোলাহলপূর্ণ জায়গায় (যেমন: মেইন দরজা বা ওয়াশিং মেশিনের পাশে) রাখা হয়, তবে বিড়াল ভয় পায়। এছাড়া বক্সটি যদি বিড়ালের আকারের চেয়ে ছোট হয়, তবে সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।
সমাধান: বক্সটি ঘরের এমন একটি শান্ত ও নিরিবিলি কোণায় রাখুন যেখানে বিড়াল পর্যাপ্ত গোপনীয়তা (Privacy) পায়। সবসময় বিড়ালের শরীরের চেয়ে অন্তত দেড় গুণ বড় সাইজের বক্স ব্যবহার করুন।
- মানসিক চাপ বা স্ট্রেস (Stress & Anxiety): ঘরে নতুন কোনো পোষা প্রাণী বা সদস্য আসা, বাড়ি বদল করা কিংবা হুট করে লিটারের ব্র্যান্ড বা সুগন্ধ বদলে ফেললে বিড়াল মানসিক চাপে পড়ে এবং এমন আচরণ করে।
সমাধান: বিড়ালকে একটি নির্দিষ্ট রুটিনে অভ্যস্ত রাখুন। লিটারের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করতে হলে পুরোনো বালির সাথে নতুন বালি অল্প অল্প করে মিশিয়ে ৭-১০ দিন সময় নিয়ে অভ্যাস করান।
- টেরিটোরিয়াল মার্কিং বা ইউরিন স্প্রে (Territorial Marking): বিড়াল প্রাপ্তবয়স্ক (Age 5-6 months+) হয়ে গেলে নিজের এলাকা চিহ্নিত করতে কিংবা বিপরীত লিঙ্গের বিড়ালকে আকৃষ্ট করতে চারপাশের দেয়ালে বা আসবাবপত্রে প্রস্রাব স্প্রে করে।
সমাধান: বিড়ালকে সঠিক বয়সে নিউটার বা স্পে (Neuter/Spay) করিয়ে নিন। এতে হরমোনজনিত কারণে বাইরে প্রস্রাব করার প্রবণতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
একটি জরুরি টিপস: বিড়াল ঘরের যে জায়গায় ভুল করে প্রস্রাব করে ফেলেছে, সেই জায়গাটি সাধারণ ডিটারজেন্ট দিয়ে না ধুয়ে ‘এনজাইমেটিক ক্লিনার’ (Enzymatic Cleaner) দিয়ে পরিষ্কার করুন। সাধারণ ক্লিনার দিয়ে ধুলে মানুষের না হলেও বিড়ালের নাকে প্রস্রাবের গন্ধ থেকে যায় এবং সে বারবার ঠিক ওই একই জায়গায় গিয়ে প্রস্রাব করতে থাকে।