বিড়াল পোষার ক্ষেত্রে যে কয়েকটি রোগকে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক এবং ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ বা জরুরি অবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রস্রাবের সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে FLUTD (Feline Lower Urinary Tract Disease) বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) বলা হয়। বিশেষ করে পুরুষ বিড়ালের (Male Cat) ক্ষেত্রে এই সমস্যা খুব দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। আপনার আদরের বিড়ালটির প্রস্রাব করতে কষ্ট হচ্ছে কিনা এবং এই অবস্থায় আপনার কী করা উচিত, তা বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো। বিড়ালের প্রস্রাবের সমস্যার প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms): বিড়ালের মূত্রথলিতে ইনফেকশন, পাথর বা ব্লক হলে তার আচরণে নিচের পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে: প্রস্রাবের কষ্ট দূর করার কার্যকরী সমাধান ও করণীয় (Solutions): বিড়ালের প্রস্রাবের সমস্যা প্রতিরোধে এবং প্রাথমিক অবস্থায় আপনি নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন: সবচেয়ে জরুরি সতর্কবার্তা (পুরুষ বিড়ালের মালিকদের জন্য): আপনার পুরুষ বিড়ালটি যদি একটানা ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মোটেও প্রস্রাব না করে, তবে ধরে নিতে হবে তার প্রস্রাবের রাস্তা পুরোপুরি ব্লক (Urethral Obstruction) হয়ে গেছে। এটি একটি চরম জরুরি অবস্থা! প্রস্রাব আটকে থাকার কারণে শরীর টক্সিক বা বিষাক্ত হয়ে পড়ে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কিডনি ফেইলিউর হয়ে বিড়ালের মৃত্যু হতে পারে। এই অবস্থায় কোনো ঘরোয়া চিকিৎসা বা ওষুধের জন্য অপেক্ষা না করে তাত্ক্ষণিকভাবে তাকে কোনো ভেটেরিনারি হসপিটালে নিয়ে যান এবং ক্যাথেটার করার ব্যবস্থা করুন।
বিড়াল স্বভাবগতভাবেই খাবারের ব্যাপারে একটু চূজি বা খামখেয়ালী হতে পারে। কিন্তু আপনার আদরের বিড়ালটি যদি হঠাৎ করেই তার নিয়মিত খাবার খাওয়া একদম বন্ধ করে দেয় বা খাবারে চরম অরুচি দেখায়, তবে সেটি বেশ চিন্তার বিষয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বিড়ালের এই খাওয়া বন্ধ করে দেওয়াকে ‘অ্যানোরেক্সিয়া’ (Anorexia) বলা হয়। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নাও হতে পারে। নিচে বিড়ালের হঠাৎ অরুচি হওয়ার কারণ, অন্যান্য লক্ষণ এবং এর সঠিক সমাধানগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: বিড়ালের অরুচির সাথে অন্যান্য যেসব লক্ষণ খেয়াল করবেন (Symptoms): বিড়াল শুধু খাবার খাচ্ছে না নাকি সাথে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যাও আছে, তা বুঝতে নিচের উপসর্গগুলোর দিকে নজর দিন: খাবারে হঠাৎ অরুচি হওয়ার কারণ ও তার সমাধান (Solutions): বিড়ালের এই হঠাৎ অরুচি দূর করতে এবং তাকে আবার খাবারের টেবিলে ফিরিয়ে আনতে আপনি নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন: অত্যন্ত জরুরি সতর্কবার্তা: একটি বিড়াল যদি একটানা ২ দিনের বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ না খেয়ে থাকে, তবে তার লিভারে ‘হেপাটিক লিপিডোসিস’ (Hepatic Lipidosis) বা ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হতে পারে, যা অত্যন্ত প্রাণঘাতী। তাই বিড়ালের অরুচিকে হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
বিড়াল ছানাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মানুষের মতো শক্তিশালী হয় না। বিশেষ করে মায়ের দুধ খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার পর তারা মারাত্মক কিছু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিড়ালের কিছু রোগ (যেমন: প্যানলিউকোপেনিয়া বা জলাতঙ্ক) এতটাই মারাত্মক যে এগুলোতে আক্রান্ত হলে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর এই মারাত্মক রোগগুলো থেকে আপনার আদরের বিড়ালকে সুরক্ষিত রাখার একমাত্র উপায় হলো সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়া। নিচে বিড়ালের ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা এবং এর সঠিক সময়সূচী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। ভ্যাকসিন কেন জরুরি এবং না দিলে কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে? বিড়ালকে সময়মতো ভ্যাকসিন না দিলে তার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। ফলে ক্যাট ফ্লু বা প্যানলিউকোপেনিয়ার মতো ভাইরাসে আক্রান্ত হলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়: বিড়ালের ভ্যাকসিনের সঠিক সময়সূচী (Vaccination Schedule): বিড়ালের বয়স এবং ভ্যাকসিনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে নিচে একটি আদর্শ চার্ট দেওয়া হলো, যা প্রতিটি বিড়ালের জন্য অনুসরণ করা উচিত:
বিড়াল পোষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবাগুলোর একটি হলো নিয়মিত কৃমির ওষুধ খাওয়ানো বা ডিওয়ার্মিং (Deworming) করা। বিড়াল খুব সহজেই তাদের মায়েদের দুধ থেকে, ঘরের মেঝে, জুতা-স্যান্ডেল কিংবা ফ্লি বা উকুনের মাধ্যমে কৃমিতে আক্রান্ত হতে পারে। পেটে অতিরিক্ত কৃমি হলে বিড়ালের পুষ্টিহীনতা, রক্তশূন্যতা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই বিড়ালকে সুস্থ রাখতে কতদিন পর পর কৃমির ওষুধ দিতে হবে এবং এর লক্ষণগুলো কী কী, তা বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো। বিড়ালের পেটে কৃমি হওয়ার প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms): বিড়ালের পেটে অতিরিক্ত কৃমি হলে শরীরে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়: বিড়ালের কৃমির ওষুধ দেওয়ার সঠিক সময়সূচী (Deworming Schedule): বিড়ালের বয়স ও জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে কৃমির ওষুধ দেওয়ার নিয়ম আলাদা হয়ে থাকে। নিচে একটি আদর্শ সময়সূচী দেওয়া হলো:
মানুষের মতো বিড়ালেরও জ্বর হতে পারে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘পাইরেক্সিয়া’ (Pyrexia) বলা হয়। তবে বিড়ালের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা মানুষের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে (সাধারণত ১০০.৫° থেকে ১০২.৫° ফারেনহাইট)। তাই শুধু গা ছুঁয়ে বিড়ালের জ্বর সঠিকভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। আপনার আদরের বিড়ালটি জ্বরে ভুগছে কিনা এবং এই অবস্থায় আপনার কী করা উচিত, তা বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো। বিড়ালের জ্বর হওয়ার প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms): বিড়ালের শরীরে কোনো ইনফেকশন বা রোগ বাসা বাঁধলে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জ্বরের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। নিচে সাধারণ কিছু লক্ষণ দেওয়া হলো যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন বিড়ালটি জ্বরে আক্রান্ত: বিড়ালের জ্বর হলে করণীয় ও সমাধান (Solutions): বিড়ালের জ্বর বুঝতে পারলে ঘরে বসে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন: অত্যন্ত জরুরি সতর্কবার্তা: নিজের বুদ্ধিতে বা মানুষের ওষুধ মনে করে বিড়ালকে কখনোই প্যারাসিটামল (যেমন: Napa, Ace) বা কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়াবেন না। প্যারাসিটামল বিড়ালের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত (Toxic) এবং এটি খাওয়ানোর ফলে বিড়ালের লিভার অকেজো হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। জ্বর ২৪ ঘণ্টার বেশি থাকলে কিংবা বিড়াল অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়লে দ্রুত রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।
বিড়াল পোষেন অথচ বিড়ালের বমি করার সমস্যায় পড়েননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। বিড়াল অনেক সময় খুব সাধারণ কারণে বমি করতে পারে, আবার কখনো কখনো এটি কোনো মারাত্মক রোগের পূর্বলক্ষণও হতে পারে। আপনার আদরের বিড়ালটি কেন বমি করছে, কখন চিন্তার কারণ আছে এবং এই অবস্থায় আপনার তাৎক্ষণিক করণীয় কী—তা বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো। বিড়ালের বমি করার ধরন ও অন্যান্য লক্ষণসমূহ (Symptoms): বিড়াল কী কারণে বমি করছে তা বোঝার জন্য তার বমির ধরন এবং শরীরের অন্যান্য পরিবর্তন খেয়াল করা জরুরি: বিড়ালের বমি বন্ধ করার কার্যকরী সমাধান (Solutions): বিড়ালের বমির সমস্যা দূর করতে এবং তাকে সুস্থ করে তুলতে আপনি নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন: কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন? যদি বিড়াল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩ বারের বেশি বমি করে, বমির সাথে রক্ত যায়, কিংবা পানি পান করার সাথে সাথেই বমি করে ফেলে—তবে ঘরে অপেক্ষা না করে দ্রুত একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ নিন।